আল্লাহ তাআলা বিবাহের মাধ্যমে নারী-পুরুষের সহবাস তথা বংশ বৃদ্ধিকে কল্যাণের কাজে পরিণত করেছেন। বিবাহের ফলে স্বামী-স্ত্রীর যাবতীয় বৈধ কার্যক্রম হয়ে ওঠে কল্যাণ ও ছাওয়াবের কাজ এবং বংশবৃদ্ধির একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীর সহবাস। কিন্তু বিভিন্ন সময় সমাজে প্রচলিত সহবাস পরবর্তী কতিপয় কুসংস্কার ও ভুল ধারণার জন্য স্বামী-স্ত্রী তাতক্ষনিক গোসল করা নিয়ে দ্বিধা এবং সমস্যায় পড়ে যান। আর আজ আমরা সেই সমস্যার সমাধান জানবো ইন-শা-আল্লাহ!। প্রশ্ন হচ্ছে স্ত্রী সহবাস এর পরপরই কি গোসল করতে হবে?  নাকি বিলম্ব করা যাবে? যদি ভুল বশত: কেউ তাতক্ষনিক গোসল না করে, তাহলে উপায় কি?। নিম্নে প্রশ্নের উত্তর প্রদান করা হল। পাশাপশি তুলে ধরা হল সমাজে প্রচলিত স্ত্রী সহবাস পরবর্তী কতিপয় কুসংস্কার ও ভুল ধারণা। চলুন জেনে নেওয়া যাক-

স্ত্রী সহবাস এর পরপরই কি গোসল করতে হবে? নাকি বিলম্ব করা যাবে?


যে কোনো কারণে গোসল ফরজ হলে তথা স্ত্রী সহবাস, স্বপ্নদোষ, হায়েয (মাসিক), নেফাস (প্রসব পরবর্তী স্রাব) ইত্যাদি কারণে গোসল ফরজ হলে তৎক্ষণাৎ গোসল করা আবশ্যক নয়। বরং ঘুম, ব্যস্ততা বা প্রয়োজনে সালাতের পূর্ব পর্যন্ত গোসল বিলম্ব করা জায়েজ আছে। এ মর্মে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। যেমন:

  • ১) হাদিসে এসেছে:

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّهُ لَقِيَهُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فِي طَرِيقٍ مِنْ طُرُقِ الْمَدِينَةِ وَهُوَ جُنُبٌ فَانْسَلَّ فَذَهَبَ فَاغْتَسَلَ فَتَفَقَّدَهُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَلَمَّا جَاءَهُ قَالَ ‏"‏ أَيْنَ كُنْتَ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ ‏"‏ ‏.‏ قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ لَقِيتَنِي وَأَنَا جُنُبٌ فَكَرِهْتُ أَنْ أُجَالِسَكَ حَتَّى أَغْتَسِلَ ‏.‏ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏"‏ سُبْحَانَ اللَّهِ إِنَّ الْمُؤْمِنَ لاَ يَنْجُسُ ‏"‏ ‏.‏

অনুবাদঃ আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি একবার মদিনার কোন এক রাস্তায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সাক্ষাৎ পেলেন। তিনি (আবু হুরায়রা রা.) তখন (জানবাত) অপবিত্র অবস্থায় ছিলেন। এই কারণে তিনি আস্তে করে পাশ কেটে চলে গেলেন এবং গোসল করলেন। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে তালাশ করলেন। পরে তিনি এলে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন: আবু হুরায়রা তুমি কোথায় ছিলে? তিনি বললেন: হে আল্লাহর রাসূল, আপনার সঙ্গে যখন আমার সাক্ষাৎ হয় তখন আমি অপবিত্র অবস্থায় ছিলাম। তাই আমি গোসল না করে আপনার সাথে উঠবস করাকে অপছন্দ করেছি। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: “সুবহানাল্লাহ! মুমিন তো অপবিত্র হয় না।

(সহিহ বুখারী ও মুসলিম। সহীহ মুসলিম, হাদিস নম্বর/৭১০ অধ্যায়ঃ ৩/ হায়েজ)

হাদিসের ব্যাখ্যাঃ “মুমিন তো অপবিত্র হয় না" এর অর্থ হল, মুমিন অভ্যন্তরিণভাবে কখনো নাপাক হয় না। বাহ্যিকভাবে শরীরে নাপাকি লাগলে শরীর নাপাক হয় কিন্তু তার মধ্যে ঈমান থাকায় সে অভ্যন্তরিণভাবে সে পবিত্র থাকে (জীবিত ও মৃত সর্বাবস্থায়)। পক্ষান্তরে কাফির বাহ্যিকভাবে যদি পরিষ্কারও থাকে তবে ঈমান না থাকার কারণে সে অভ্যন্তরিণভাবে নাপাক।

ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন:  فيه جواز تأخير الاغتسال عن أول وجوبه

 অনুবাদঃ  “এ হাদিসে গোসল ফরজ হওয়ার পর তা বিলম্ব করার বৈধতা পাওয়া যায়।”  (সহিহ বুখারির ব্যাখ্যা গ্রন্থ ফাতহুল বারী)

  • ২) আরেকটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,

عن غضيف بن الحارث، قال: قلت لعائشة: أكان النبي صلى الله عليه وسلم يغتسل قبل أن ينام؟ وينام قبل أن يغتسل؟ قالت: نعم. قلت: الحمد لله الذي جعل في الأمر سعة

অনুবাদঃ গাযীফ ইবনুল হারিস রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি আয়েশা রা. কে প্রশ্ন করলাম, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কি ঘুমের পূর্বে গোসল করতেন অথবা গোসলের পূর্বে ঘুমাতেন? তিনি বললেন: হ্যাঁ। আমি বললাম: (আল-হামদু-লিল্লাহ) সকল প্রশংসা ঐ আল্লাহ তায়ালার যিনি বিষয়টিতে ছাড় রেখেছেন।

(সহিহ আবু দাউদ, হা/২২৬)


  • ৩) এ ছাড়াও সহিহ সনদে প্রমাণিত হয়েছে যে, 
রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্ত্রী সহবাসের পর শরীর নাপাক অবস্থায় রমাযান মাসে ভোর রাতে সেহরি খেয়েছেন। তারপর ফজরের আজান হলে গোসল করে মসজিদে সালাত আদায়ের জন্য গেছেন।

উল্লেখ্য যে, একটি হাদিসে এসেছে: “যে ঘরে জুনুবি ব্যক্তি (গোসল ফরজ হয়েছে এমন নাপাক ব্যক্তি) এবং কুকুর থাকে সে ঘরে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।” এই হাদিসটি মুহাদ্দিসগণের নিকট জইফ বা দুর্বল।

তবে, হ্যা সালাতের সময় হয়ে গেলে গোসলের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করে সালাত আদায় করা আবশ্যক। কেননা সালাত আদায় করা যেমন ফরয তেমনি সালাতের জন্য পাক-পবিত্রতা অর্জন করা পূর্বশর্ত বা ফরজ।


স্ত্রী সহবাস এরপর গোসল করতে বিলম্ব করলে ওজু করা মুস্তাহাব


স্ত্রী সহবাসের পর বা যেকোনো কারনে গোসল ফরজ হলে কেউ ইচ্ছে করলে তৎক্ষণাৎ গোসল করে নিতে পারে আবার ইচ্ছে করলে বিলম্বও করতে পারে। বিলম্ব করতে চাইলে অজু করে নেওয়া মুস্তাহাব বা উত্তম।

  • হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:

في الصحيحين أن عمر استفتى رسول الله صلى الله عليه وسلم: أينام أحدنا وهو جنب؟ قال: "نعم، إذا توضأ".

অনুবাদঃ হযরত ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট প্রশ্ন করলেন, শরীর নাপাক অবস্থায় কি কেউ ঘুমাতে পারে? তিনি বললেন: “হ্যাঁ, যদি অজু করে।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

হাদিসের ব্যাখ্যাঃ “ইবনে আব্দুল বার বলেন, জুমহুর তথা অধিকাংশ আলেম এই মত ব্যক্ত করেছেন যে, যে জুনুবি (নাপাক) ব্যক্তি ঘুমাতে চায় তার জন্য ওজু করার নির্দেশ টি মুস্তাহাব পর্যায়ের।”

স্ত্রী সহবাস এরপর গোসল করা সম্পর্কে কতিপয় ভুল ধারণা ও ভিত্তিহীন কথা


  1. সহবাসের সাথে সাথেই গোসল করতে হবে; নয়তো গুনাহ হবে।
  2. সহবাস করে গোসলের পূর্বে মাটিতে পা রাখা যাবে না। অন্যথায় মাটি বদ দুআ করবে এবং অভিশাপ দিবে।
  3. সহবাস করার পর গোসলের পূর্বে কোন কিছুতে হাত দেয়া যাবে না। এই অবস্থায় কোন কিছুতে হাত দিলে তা অপবিত্র হয়ে যাবে।
  4. এ অবস্থায় রান্না-বান্না করলে বাড়ি থেকে লক্ষ্মী চলে যাবে। (এটি স্পষ্ট শিরক)
  5. গোসলের পূর্বে হাতে কিছু নিয়ে দরজা ধরতে হবে।
  6. নাপাক অবস্থায় খাওয়া-দাওয়া করা যাবে না।
  7. এ অবস্থায় রান্না-বান্না করা যাবে না।
  8. ঘর-বাড়ি ঝাড়ু দেয়া যাবে না।
  9. সন্তানকে বুকের দুধ পান করানো যাবে না।
  10. অবস্থায় দুআ-তসবিহ, জিকির-আজকার পাঠ করা যাবে না।


এ সবই কুরআন-সুন্নাহ বর্হিভূত ভুল ধারণা ও বাতিল কথা। ইসলামে এ সব কথার কোন ভিত্তি নাই। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দীনের সঠিক জ্ঞান ও বুঝ দান করুন এবং সর্ব প্রকার বাতিল ও কুসংস্কার থেকে হেফাজত করুন। আমিন। আল্লাহু 'আলাম।

উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

▬▬▬✪◯✪▬▬▬

Post a Comment

Previous Post Next Post