আল্লাহ তায়ালার একটি অন্যতম বিধান বা হুকম হচ্ছে গোসল, যা খুভই গুরুত্বপূর্ণ। কারো উপর গোসল ফরয হলে, সে যদি সঠিকভাবে গোসল করতে না পারে। তাহলে তার কখনো নামায হবে না। ফরজ গোসলের সঠিক নিয়ম না জানার কারণে অসংখ্য মুসলিম ভাই- বোনের নামাজ সহ নানা আমল কবুল হবে না। যেটা ঈমানের জন্য ধ্বংসাত্মক (নাউযুবিল্লাহ)। আপনি যদি নিয়ম না মেনে এক সাগর পানি দিয়ে গোসল করেন তাহলেও আপনার ফরজ গোসল আদায় হবে না। অবশ্যই সুন্নাহ (তরিকা) মেনে নিয়মানুযায়ী ফরজ গোসল করতে হবে। নিম্নে  ফরজ গোসলের সঠিক পদ্ধতি সহ গোসলের ফরজ ও সুন্নত সমূহ তথ্যসুত্রসহ উপস্থাপন করা হলো:


যে সব কারণে গোসল ফরজ হয়ঃ
  • ১) স্বপ্নদোষ বা উত্তেজনাবশত বীর্যপাত হলে। তবে মজি বা কামরস বের হলে গোসল ফরজ হবে না।
  • ২) সহবাস করলে (সহবাসে বীর্যপাত হোক আর নাই হোক)।
  • ৩) মেয়েদের হায়েয (মাসিক) বা নিফাস (প্রসব পরবর্তী স্রাব) শেষ হলে।
  • ৪) ইসলাম গ্রহন করলে (নব-মুসলিম হলে)।


গোসলের ফরজ তিনটি:
  • ১) ভালভাবে একবার কুলি করা। [সূরা: মায়িদা,আয়াত নং- ৬] তবে রোযা অবস্থায় শুধু কুলি করতে হবে, গড়গড়া সহ কুলি করা যাবেনা।
  • ২) নাকের নরমস্থান পর্যন্ত একবার পানি পৌঁছানো। [ঐ] তবে রোযা অবস্থায় শুধু নাকে পানি দিতে হবে, নরম হাড় পর্যন্ত পানি প্রবাহ করা যাবে না।
  • ৩) সমস্ত শরীরে একবার পানি পৌঁছে দেয়া, যেন কোথাও এক চুল পরিমাণ শুকনো না থাকে। [ঐ/ তিরমিযী, ১০৩; আল বাহরুর রায়িক,১: ৪৫/ শামী, ১ : ১৫১]

ফরজ গোসলের সঠিক নিয়ম বা সুন্নত তরিকাঃ

  • ১) শুরুতে নিয়ত করা এবং বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম পড়া। [বুখারী শরীফ, হাদীস নং-২৪৮]
  • ২) পৃথকভাবে উভয় হাত কব্জিসহ ধোয়া। [বুখারী শরীফ, হাদীস নং-২৪৮]
  • ৪) শরীর বা কাপড়ের কোন স্থানে নাপাকী লেগে থাকলে প্রথমে তা তিনবার ধুয়ে পবিত্র করে নেয়া। [মুসলিম শরীফ, হাদীস নং-৩২১]
  • ৫) নাপাকী লেগে থাকলে বা না লেগে থাকলে সর্ব অবস্থায় গুপ্তাঙ্গ ধৌত করা। এরপর উভয় হাত ভালভাবে ধুয়ে নেয়া। - [বুখারী শরীফ, হাদীস নং-২৪৯]
  • ৬) নামাজের অজুর মতো ভালভাবে পূর্ণরূপে অজু করা। এক্ষেত্রে শুধু পা দুটো বাকি রাখলেও চলবে, যা গোসলের শেষে ধুয়ে ফেলতে হবে। তবে গোসলের স্থানে পানি জমে থাকলে, গোসল শেষ করে পা ধৌত করবে। [বুখারী শরীফ, হাদীস নং-২৫৭, ২৫৯, ২৬০, ২৬৫]
  • ৭) প্রথমে মাথায় পানি ঢালা। [বুখারী শরীফ, হাদীস নং-২৫৬]
  • ৮) এরপর ডান কাঁধে পানি ঢালা। [বুখারী শরীফ, হাদীস নং-২৫৪]
  • ৯) এরপর বাম কাঁধে পানি ঢালা। [বুখারী শরীফ, হাদীস নং-২৫৪]
  • ১০) অতঃপর অবশিষ্ট শরীর ভিজানো। [বুখারী শরীফ, হাদীস নং-২৭৪]
  • ১১) সমস্ত শরীরে এমনভাবে তিনবার পানি পৌঁছানো, যেন একটি পশমের গোড়াও শুষ্ক না থাকে। [আবু দাউদ, হাদীস নং-৪৯/ মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং- ৮১৩] তবে নদী-পুকুর ইত্যাদিতে গোসল করলে কিছুক্ষণ ডুব দিয়ে থাকলেই তিন বার পানি ঢালার সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে। [আবু দাউদ, হাদীস নং-২৪৯/ মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহ, হাদীস নং-৮১৩]
  • ১২) সমস্ত শরীর হাত দ্বারা ঘষে-মেজে ধৌত করা। [তিরমিযী, হাদীস নং-১০৬]
  • ১৩) মহিলাদের জন্য কানে-নাকে অলংকারাদী থাকলে, তার ছিদ্র ও আংটি, চুড়ি বা বয়লা ইত্যাদি নাড়া চাড়া দিয়ে পানি পৌঁছিয়ে দেয়া।
  • ১৪) শরীরের যে সমস্ত অঙ্গে সাধারণত পানি পৌঁছতে চায় না, যেমন:- কান, আঙ্গুলের ফাঁক, কনুই, বগলের নীচ, চোখের কিনারা, চুলের গোড়া ইত্যাদি অঙ্গে খেয়াল করে পানি পৌঁছানো। (নখে নখপালিশ থাকলে, তা সম্পূর্ণ উঠানো ব্যতীত অযূ গোসল হবে না।)
  • ১৫) গোসলের ভিজা কাপড় তিনবার ধুয়ে তিনবার নিংড়ানো।

এটাই হচ্ছে গোসলের সঠিক নিয়ম। উল্লেখ্য, এইভাবে গোসল করলে এর পরে নামাজ পড়তে চাইলে আলাদা করে অজু করতে হবেনা, যদি গোসল করার সময় অজু ভঙ্গের কোনো কারণ ঘটে না থাকে। গোসলের পরে কাপড় পরিবর্তন করলে বা হাঁটুর উপরে কাপড় উঠে গেলে অজু ভঙ্গ হবে না। কেননা এটা ওযু ভঙ্গের কারণ না। আল্লাহ আমাদের সঠিকভাবে ফরজ গোসল করার ও এ জ্ঞান সকলের কাছে পৌছে দেয়ার তওফিক দান করুন। আমীন


উত্তর দিয়েছেন:-

বিশিষ্ট্য মুফতী মনসূরুল হক দা.বা.
প্রধান মুফতী ও শাইখুল হাদীস:- জামিয়া রহমানিয়া, মুহাম্মাদপুর,ঢাকা।

Post a Comment

Previous Post Next Post